বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক আয়ের উপর আয়কর প্রদান একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। আমাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের শেষ সময় সাধারণত ৩০ নভেম্বর (কর দিবস) এর মধ্যে হয়। যাদের টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) রয়েছে, যাদের বার্ষিক আয় নির্দিষ্ট সীমার বেশি, বা যাদের কোনো আর্থিক লেনদেনের কারণে টিআইএন প্রয়োজন, তাদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি আগেভাগে আয়কর সংক্রান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তবে রিটার্ন দাখিলে কোনো ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হলো, যা আপনাকে আয়কর ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হতে এবং ঝামেলাহীনভাবে রিটার্ন দাখিল করতে সাহায্য করবে।
১। ই-রিটার্ন (E-Return) সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুন
বর্তমানে বাংলাদেশে ই-রিটার্ন ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যার মাধ্যমে আপনি ঘরে বসেই সহজেই আপনার কর রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। এটি আয়কর রিটার্ন দাখিলের একটি ডিজিটাল পদ্ধতি, যা হয়রানিমুক্ত এবং সহজ।
✅ কীভাবে ই-রিটার্ন জমা দেওয়া যায়?
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ই-রিটার্ন পোর্টালে (https://www.etr.gov.bd/) নিবন্ধন করুন।
- প্রয়োজনীয় তথ্য, আয়-ব্যয়ের হিসাব, উৎসে কর কর্তনের তথ্য (যদি থাকে) এবং প্রয়োজনীয় দলিলাদি সংযুক্ত করুন।
- অনলাইনেই ফরম পূরণ করে সাবমিট করুন এবং প্রাপ্তি স্বীকারপত্র (Acknowledgment Receipt) ডাউনলোড করুন।
২। আয়কর আইন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিন
কর আইন সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কোনো করজাল বা প্রতারণার শিকার হতে না হয়।
✅ বেসিক কর আইন সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- ব্যক্তিগত আয়কর উৎসে কর্তনের হার (TDS) এবং করমুক্ত সীমা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
- যেসব খাত কর রেয়াতের আওতাভুক্ত (যেমন: জীবনবীমা, সঞ্চয়পত্র, শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ ইত্যাদি) সেগুলো সম্পর্কে সচেতন হোন।
- আয়কর নোটিশ সংক্রান্ত নিয়মাবলি বুঝতে চেষ্টা করুন, যাতে ভুলের কারণে জরিমানার সম্মুখীন না হতে হয়।
উদাহরণ: অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আয়কর আইন না জানার কারণে নোটিশের যথাযথ উত্তর না দেওয়ার ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত জরিমানা গুনতে হয়। যেমন, একজন করদাতা আয়কর নোটিশ পেয়েও সঠিক সময়ে সাড়া না দেওয়ায় এক লক্ষাধিক টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
৩। লেনদেন ও হিসাব-নিকাশ স্বচ্ছ রাখুন
✅ যে কারণে স্বচ্ছ হিসাব রাখা জরুরি:
- ব্যাংকে টাকা জমা, ব্যবসার লেনদেন, বেতন-ভাতা, খরচের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
- নগদ লেনদেন সীমিত রাখুন এবং ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করুন, যাতে আপনার অর্থের উৎস পরিষ্কার থাকে।
- যদি আয়কর অফিস আপনার রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচন করে, তাহলে এসব প্রমাণপত্র আপনাকে রক্ষা করবে।
- বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে লেনদেন করলে তার স্টেটমেন্ট সংরক্ষণ করুন।
৪। কর রেয়াতের সুবিধাগুলো কাজে লাগান
বাংলাদেশে বেশ কিছু কর রেয়াত সুবিধা (Tax Rebate Facilities) রয়েছে, যা আপনাকে করের বোঝা কমাতে সাহায্য করবে।
✅ কোন খাতে বিনিয়োগ করলে কর রেয়াত পাওয়া যায়?
- জীবন বীমা ও স্বাস্থ্য বীমা: নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ করলে কর রেয়াত পাওয়া যায়।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত: নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যয়ের বিপরীতে কর ছাড় পাওয়া সম্ভব।
- সঞ্চয়পত্র ও শেয়ারবাজার বিনিয়োগ: অনুমোদিত সীমার মধ্যে বিনিয়োগ করলে কর রেয়াত পাওয়া যায়।
- স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বা ট্রাস্টে দান: নির্দিষ্ট কিছু দান বা অনুদানের বিপরীতে কর রেয়াত পাওয়া যায়।
👉 পরিকল্পিতভাবে সারা বছর ধরে এসব খাতে বিনিয়োগের অভ্যাস গড়ে তুললে কর রেয়াতের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
৫। সময়মতো রিটার্ন দাখিলের প্রস্তুতি নিন
- আয় ও ব্যয়ের হিসাব পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করুন।
- কোনো আয়কর নোটিশ পেলে দ্রুত কর পরামর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
- অর্থবছরের শেষের দিকে নয়, বরং আগেভাগে আয়কর রিটার্ন দাখিলের কাজ শুরু করুন।
শেষ কথা
যদি আমরা সময়মতো পরিকল্পিতভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিলের অভ্যাস গড়ে তুলি, তবে কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়াই সহজে রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে, কর রেয়াতের সুবিধাগুলো গ্রহণ করে আমরা আমাদের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি করতে পারবো।
সবার জন্য কর সচেতনতা জরুরি, কারণ এটি ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।