বৃক্ষ ও নদী ছাড়া জীবন যেন প্রাণহীন মহাশ্মশান

গাছ হলো মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে অপরিহার্য অঙ্গ। গাছ ছাড়া পৃথিবীতে মানুষ তো দূর, কোন প্রাণীর পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সন্তানের জন্মের সময়ে সে যেমন মায়ের নাড়ীর সাথে যুক্ত থাকে, ঠিক সেইরকমভাবে মানব সভ্যতার জন্ম ও যেন জড়িয়ে আছে গাছের নাড়ীর সাথে। কিন্তু অবুঝ মানুষ নিজেকে বিশাল ভেবে, প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি ঘটিয়ে কুড়ুল মেরেছে নিজেই নিজের পায়ে। দূষিত করেছে পরিবেশ। প্রচুর পরিমানে জঙ্গল কে নিশ্চিহ্ন করে দেখাতে চেয়েছিল নিজের জায়গা। কিন্তু প্রযুক্তি বিদ্যা হার মেনেছে গাছের অস্তিত্বের কাছে। স্বীকার করেছে যে গাছের সাহায্য ছাড়া এই বিশাল পরিবেশে অক্সিজেন সরবরাহ করা এই উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার পক্ষে দুঃসাধ্য। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন কারণবশত বিশ্বজুড়ে গাছের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে এক মহাসংকটের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকট দূরীকরণের উদ্দেশ্যে বিশ্বজুড়ে সবুজ আন্দোলনের উদ্যোগে শুরু হয়েছে আন্দোলন। এই শ্লোগান এবং বিশ্বব্যাপী উদ্ভিদের ব্যাপক ও সর্বৈব প্রাসঙ্গিকতা সংক্রান্ত আলোচনার উদ্দেশ্যেই আমার আজকের এই উপস্থাপনা। নদীর মৃত্যু আর গাছ, পাখি কিংবা মানুষের মৃত্যু এক না। গাছ, পাখি কিংবা মানুষ বংশধর সৃষ্টি করে হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে কিন্তু একটি নদী, যা সৃষ্টি হতে লাগে কয়েকশ বছর তাকে এক বছরের মধ্যেই মেরে ফেলা যায়- কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও মানুষ একটিও নদী সৃষ্টি করতে পারে না। তবু মানুষ নির্বিচারে নদীকে মেরে কেবল বড়নদী থেকে উৎপন্ন উপনদী, শাখানদী আর প্রশাখানদী। অবশ্য কিছু কিছু বড় নদীও এখন মৃত্যুপথ যাত্রী। মানবসৃষ্ট কিছু স্থাপনা ও পরিকল্পনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন এদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমি যেহেতু ঢাকায় বসবাস করি তাই বুড়িগঙ্গার কথাই বলি। বুড়িগঙ্গা যেন বুক পেতে দিয়েছে ঢাকা শহরের সমস্ত বর্জ্য ধারণ করবার জন্য। বুড়িগঙ্গাতে প্রতিদিন ঢালা হয় বিভিন্ন শিল্প কারখানার, ট্যানারির, হাসপাতাল ও ইটভাটার বর্জ্য, কয়েক টন পলিথিন। এভাবে বুড়িগঙ্গায় প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার টন নানা ধরনের ধরনের আবর্জনা আর ট্যানারির বাইশ হাজার লিটার বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হয়। পলিথিন জমে বুড়িগঙ্গার তলদেশ দশ বারো ফুট ভরাট হয়ে গেছে। এই ঢালা কর্ম ঠেকানোর জন্য আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। বুড়িগঙ্গার দূষণ আরো বাড়িয়ে চলেছে ওয়াসা। প্রতিটি বড় শহরেই বৃষ্টিজল বাহী নালা আর পয়ঃনিষ্কাশন নালা আলাদা থাকে কিন্তু আমাদের ঢাকা ওয়াসা এই দুই ধরনের নালাকে একত্রিত করে বুড়িগঙ্গায় ফেলছে ফলে বুড়িগঙ্গার আজ এই অবস্থা দাঁড়াল। এর- দুপাশ ভূমিদস্যুদের দখলকৃত, নদীতল পলিথিনে ভরাট আর পানি দূষিত! এই দূষিত পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায়। জলজ জীবন বিকশিত হবার জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমান অন্তত চার পিপিএম হতে হবে কিন্তু বুড়িগঙ্গায় তার পরিমান শূন্য পিপিএম। ফলে বুড়িগঙ্গায় কোন মাছ নেই, জীবন নেই। বুড়িগঙ্গা এক মৃত নদী।

আপনার মতামত দিন
শেয়ার করুন